আহলে বাইতে রাসুল এর পরিচয় ও ফযিলত
আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: 

إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تطهيراً 

হে আহলে বাইআতগণ। আল্লাহ চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণভাবে পুত-পবিত্র রাখতে।২৬


আহলে বাইত দ্বারা কারা উদ্দেশ্য তা নিয়ে ওলামাগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন আহলে বাইত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো আহলে আবা তথা রাসূল হযরত আলী, ফাতেমা, হাসান ও হোসাইন (رضي الله عنه)। যাদেরকে পঞ্জেতন পাকও বলা হয়। তারা দলীল হিসেবে মুসলিম শরীফে হযরত সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত হাদিস পেশ করেন। তিনি বলেন:

 لما نَزَلَتْ هَذه الآية تَدْعُ أَبْنَاتَنَا وَأَبْنَائِكُمْ حسين فَقَالَ اللهُمَّ هَوالَاء أَهْلُ دَعَا رَسُوْلُ الله صلى الله عليه وسلم عَلَيَّا وَفَاطِمَةَ وَحَسَنَا وَ 

 যখন আয়াতে মুবাহালা নাযিল হলো তখন রাসূল (ﷺ) হযরত আলী, ফাতেমা, হাসান ও হোসাইন (رضي الله عنه) কে ডেকে এনে বললেন, হে আল্লাহ! এরা আমার আহলে বাইত।"২৭


হযরত আয়েশা (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: 

خَرَجَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ غَدَاةَ وَعَلَيْهِ مِرْطٌ مُرَحْلٌ مِنْ شَعْرِ أَسْوَدَ فَجَاءَ الْحَسَنُ بْنُ عَلِيَّ فَأَدْخَلَهُ ثُمَّ جَاءَ الْحُسَيْنُ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمْ فَدَخَلَ مَعَهُ ثُمَّ جَاءَتْ فَاطِمَةُ فَأَدْخَلَهَا ثُمَّ جَاءَ عَلَى فَأَدْخَلَهُ ثُمَّ قَالَ الرجس أهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا

একদিন নবী করিম (ﷺ) সকাল বেলা বাড়ী থেকে বের হলেন। এ সময় তাঁর উপর একটি কালো রঙের রুমী চাদর জড়ানো ছিল। তখন হযরত হাসান, হোসাইন, ফাতেমা ও আলী (رضي الله عنه) একের পর এক আগমন করেন এবং তিনি তাঁদের সকলকে স্বীয় চাদরের ভিতরে প্রবেশ করিয়ে নেন আর إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ আয়াত তিলাওয়াত করেন।২৮


২৬. সূরা আহযাব, আয়াত-৩৩


২৭. শায়খ ওয়ালী উদ্দিন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ (رحمة الله) (৭৪০ হি.), মিশকাত শরীফ, পৃঃ-৫৬৮


২৮. শায়খ ওয়ালী উদ্দিন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ (رحمة الله) (৭৪০হি), মিশকাত শরীফ, পুঃ-৫৬৮), ইমাম মুসলিম (رحمة الله) (২৬১ হি.) মুসলিম শরীফ, হাদিস নং ৬১৩৯


এ ঘটনায় আরো বর্ণিত আছে- উম্মুল মু'মিনীন হযরত উম্মে সালমা (رضي الله عنه) চাদর উঠিয়ে তিনিও তাঁদের সাথে প্রবেশ করার চেষ্টা করলে রাসূল তাঁর হাত থেকে চাদর টেনে নিলেন। এতে উম্মে সালমা (رضي الله عنه) আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! (ﷺ) আমিও আপনাদের সাথী হতে চাই। উত্তরে রাসূল বললেন- 

الكَ مِنْ أَزْوَاج النبي صلى الله عليه وسلم على خير 

তুমি নবীর স্ত্রীগণের অন্তর্ভুক্ত, কল্যাণের উপর আছ।


ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه) ও ইকরামা (رحمة الله)'র মতে আহলে বাইত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো উম্মাহাতুল মু'নিনীন। কেননা উক্ত আয়াত এদের সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে।


তবে জমহুর ওলামাগণের অভিমত হলো আহলে বাইত দ্বারা পঞ্জেতনপাক ও উম্মাহাতুল মু'মিনীন উভয় উদ্দেশ্য। তবে কেউ এদের সাথে হযরত আব্বাস, জাফর ও হামযা (رضي الله عنه)কে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কিন্তু শায়খ আব্দুল হক মুহদ্দিস দেহলভী (رحمة الله) বলেন- বিশেষভাবে যখন আহলে বাইত বলা হয় তখন কেবল হযরত আলী, ফাতেমা, হাসান ও হোসাইন (رضي الله عنه) এই চারজনকেই বুঝায়। কেননা আহলে বাইত শব্দটি এই চারজনের জন্যেই ব্যবহার হয়।২৯


২৯. শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী (رحمة الله) (১০৫২ হি.), আশয়াতুল লুমআত, খণ্ড ৪, পৃঃ-৬৮১


উপরে বর্ণিত আয়াত শরীফে আহলে বাইতের ফযিলত ও মর্যাদা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন স্বয়ং মহান আল্লাহ তায়ালা। কারণ স্বয়ং আল্লাহই তাঁদেরকে যাবতীয় নাপাকী তথা পাপাচার ও গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখেন। আর আল্লাহ যাদেরকে হেফাযত করেন তাদেরকে কেউ গোমরাহ করতে পারে না।


আহলে বাইতের ফযিলত সম্পর্কে অসংখ্য সহীহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। মুসলিম শরীফে হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত আছে, একদিন রাসূল মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী জুহফা নামক স্থানে গদীরে ঘুম এর নিকটে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিচ্ছিলেন। তিনি প্রথমে আল্লাহর প্রশংসা করেন এবং লোকদেরকে ওয়ায নসীহত করেন। তিনি বলেন: 

أمَّا بَعْدُ أَلَا يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ يُوشِكُ أَنْ يَأْتِيَنِي رَسُولُ رَبِّي عز وَجَلٌ فَأَجِيبُ وَإِنِّي نَارِكَ فِيكُمْ تَقلَيْنِ أَوَّلُهُمَا كِتابُ الله عَزَّ وَجَلَّ فِيهِ الْهُدَى وَالنُّورُ فَخُذُوا بِكِتَابِ اللَّهِ تَعَالَى وَاسْتَمْسِكُوا بِهِ فَحَتْ عَلَى كِتَابِ اللهِ وَرَغْبَ فِيهِ قَالَ وَأَهْلُ بَيْتِي أَذَكِّرُكُمُ اللَّهَ فِي أَهْلِ بَيْنِي أَذَكِّرُكُمُ اللهَ فِي أَهْلِ بَيْتِي أَذَكِّرُكُمْ اللَّهَ فِي أَهْلِ بَيْنِي 

আম্মাবা'দ! হে লোক সকল আমি মানুষ। অচিরেই আমার কাছে আমার প্রভূর দূত তথা আজরাঈল (عليه السلام) আমার মৃত্যুর জন্য আগমন করবে আর আমি মৃত্যু কবুল করব। আমি তোমাদের নিকট দু'টি অতি মূল্যবান জিনিস রেখে যাচ্ছি, প্রথমটি হলো কিতাবুল্লাহ, যাতে রয়েছে হিদায়েত ও আলো। তোমরা কিতাবুল্লাহকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধর এবং এর উপর আমল কর। তিনি কিতাবুল্লাহর প্রতি লোকদেরকে উৎসাহিত করেছেন। এরপর বললেন- দ্বিতীয় মূল্যবান বস্তু হলো আমার আহলে বাইত। আমি তোমাদেরকে আমার আহলে বাইত সম্পর্কে আল্লাহর স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। একথাটি তিনি বারবার বলেছেন।৩০


তিরমিযী শরীফে হযরত জাবির (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-

رأیت رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي حَجَّتِهِ يَوْمَ عَرَفَةً وَهُوَ عَلَى نَاقَتِهِ الْقَصْوَاءِ يَخْطُبُ فَسَمِعْتُهُ يَقُولُ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي قَدْ تَرَكْتُ فيكم ما إن أحدكم به لن تصلُّوا كِتَابَ اللهِ وَعَفْرَتِي أَهْلَ بَيْنِي 

আমি রাসূল (ﷺ) কে বিদায় হজ্জে আরফার দিন তাঁর কাসওয়া নামক উটনীর ওপর বসে ভাষণ দিতে দেখেছি। আমি তাঁকে বলতে শুনেছি- হে লোক সকল! আমি তোমাদের মধ্যে এমন বস্তু রেখে যাচ্ছি যদি তোমরা তা আঁকড়ে ধর তবে কখনো পথভ্রষ্ট হবেনা। একটি হলো কিতাবুল্লাহ অপরটি হলো আমার আওলাদ, আমার আহলে বাইত।"৩১


ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (رحمة الله) স্বীয় মুসনদে হযরত আবু যর (رضي الله عنه) থেকে বর্ণনা করেন- 

 انَّهُ قَالَ وَهُوَ أَحَدٌ باب الكعبة سميت النبي صلى الله عليه وسلم يَقُولُ أَلا إِنَّ مِثل ** أهل بينِي فِيكُمْ مِثلُ سَفِينَةِ نُوحٍ مَنْ رَكِبَهَا نَجَا وَمَنْ تَخَلَّفَ عَنْهَا أَهْلُكَ. 

হযরত আবু যর (رحمة الله) কা'বা শরীফের দরজা ধরে বললেন, আমি রাসূল কে বলতে শুনেছি- সাবধান! তোমাদের মধ্যে আমার আহলে বাইতের দৃষ্টান্ত হলো হযরত নূহ (عليه السلام)'র নৌকার ন্যায়। যারা নৌকায় আরোহণ করবে তারা মুক্তি পাবে আর যারা বিমুখ থাকবে তারা ধ্বংস হবে।


৩০. শায়খ ওয়ালী উদ্দিন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ (رحمة الله) (৭৪৯হি), মিশকাত শরীফ, পৃঃ-৫৬৮


৩১. শায়খ ওয়ালী উদ্দিন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ (رحمة الله) (৭৪৯হি), মিশকাত শরীফ, পৃঃ-৫৬৯


আসসালামু আলাইকুম ইসলামী বিশ্বকোষ গ্রবথ S2 : https://play.google.com/store/apps/details?id=com.srizwan.islamipedia
 
Top